জেফ বেজোস- বর্তমান পৃথিবীর সেরা ধনী

0
447
জেফ বেজোস

সাধারন লজিক হল আপনি যেটা মনে প্রানে চাইবেন, যে বিষয়টার প্রতি আপনার আগ্রহ থাকবে সে সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকবে অগাধ। কারন, আপনার প্রিয় বিষয়ের উপর আপনার পড়াশোনা থাকবে। যেখানে যা পাবেন তাই আপনি পড়ে ফেলবেন। এখন, পৃথিবীতে আপনি যেহেতু ধনী হতে চান তাবৎ পৃথিবীর ধনী ব্যক্তিদের নাম থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছুই আপনার জানা থাকার কথা। এখনকার সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তির নাম কি আপনি জানেন? যদি না জেনে থাকেন তাহলে আজকের এই ব্লগ আপনার জন্যই। হ্যা, ঠিক ধরেছেন। বলছিলাম এখনকার সময়ের (সাল-২০২০) এক নম্বর ধনী ব্যক্তি জেফ বেজোস সম্পর্কে, amajon.com এর প্রতিষ্ঠাতা। তার এই মুহূর্তে সম্পদের পরিমাণ ১৯৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার।

জন্ম এবং প্রাথমিক জীবন

জেফ বেজোস জন্ম গ্রহন করেন ১৯৬৪ সালের ১২ই জানুয়ারি Albuquerque, New Mexico শহরে। তার জন্মের সময় তার মায়ের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তিনি সেসময় হাই স্কুলের ছাত্রি ছিলেন। তার পিতার ছিল একটি বাইকের শোরুম। জেফ বেজোসের জন্মের পর তার বাবা-মার ডিভোর্স হয়ে যায়।

পরবর্তীতে জেফের মা বিয়ে করেন মিগুয়েল বেজোস নামের এক কিউবান ইমিগ্র্যান্টকে, সে সময় জেফের বয়স মাত্র ৪ বছর। জেফের নতুন পিতা তাকে দত্তক হিসেবে নেয় এবং আইনগতভাবে তার নামের শেষে পিতার উপাধি বেজোস যুক্ত হয় এবং তার নাম অফিসিয়ালি জেফ বেজোস হয়ে যায়।

তারপর তারা পুরো পরিবার নিয়ে হাস্টন শহরে চলে যান যেখানে কাছাকছি তার নানীর বাড়ি ছিল। বাবা ওখানে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ পেয়ে যান। তার নানীর বাড়ি দক্ষিন স্যান এন্টোনিও তে  এখানে ছিল তাদের গবাদি পশুর খামার।

টেক্সাসে তিনি বড় হতে থাকেন। তাদের বাড়ির গ্যারেজকে তিনি ছোট বেলা থেকেই স্কুলের বিজ্ঞান গবেষনাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি তার নানার খামারে কজ করতেন। এখান থেকে তিনি অনেক কিছুই শিখেছেন। পরবর্তীতে তিনি এই খামার কিনে নেন এবং একে আরও অনেক বড় করেন মানে ৩০০,০০০ একরে রূপান্তরিত করেন আগে যা ছিল মাত্র ২৫০০০ একর।

জেফ যখন হাই স্কুলের ছাত্র তার পরিবার আবারও মায়ামিতে চলে আসে। সেসময় জেফ ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করতেন। হাই স্কুলে পড়াকালীন তিনি ছিলেন মারাত্মক মেধার পরিচয় দেন, রেকর্ড মার্কস পেয়ে তিনি স্কুল থেকে পাশ করেন। স্কুলের এক বক্তৃতায় তিনি বলেন পৃথিবীর মানুষ একদিন পৃথিবীর বাইরে উপনিবেশ তৈরি করবে। আজও তিনি এই স্বপ্ন দেখেন আর স্পেস নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি অগাধ আকর্ষণ ছিল, যার ফলাফল আমরা আজ স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তিনি ফিজিক্স পড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ভর্তি হলেও পরে তিনি তা পরিবর্তন করে কম্পিউটার বিভাগে চলে আসেন, কারন কম্পিউটারের প্রতি তার প্রচন্ড আকর্ষণ ছিল। তিনি কম্পিউটার সাইন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর তিনি তার গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।

শ্রেষ্ঠ ধনীদের জীবনী

চাকুরি জীবনেও সফল

গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি ফিটেল নামের একটি ফিন্যান্সিয়াল টেকনলোজি ফার্মে কাজ শুরু করেন। ১৯৯০ সালে তিনি D. E. Shaw & Co.  নামের একটি কম্পানিতে ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট পদে যোগদান করেন। তিনি সেখানে হেজ ফান্ড নিয়ে কাজ করেন যা এখনকার দিনে বেশ জনপ্রিয় এবংসারা বিশ্বে প্রচলিত।১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং চতুর্থ ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে উন্নিত হন, তখন তার বয়স মাত্র ৩০ বছর।

জেফ বেজোসের আমাজন প্রতিষ্ঠা

ইন্টারনেট নিয়ে জেফের সব সময়ই আকর্ষণ ছিল এবং তিনি কিছু করতে চাইতেন ইন্টারনেট কেন্দ্রিক। একদিন নিউইয়র্ক থেকে সিয়াটল ড্রাইভ করার সময় হঠাত তার মাথায় আমাজন প্রতিষ্ঠার কথা মনে হয় এবং ১৯৯৪ সালে তিনি আনুশঠানিকভাবে আমাজন প্রতিষ্ঠা করেন।

বেজোস তার গ্যারেজে অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দুই বেডের একটি এপার্টমেন্টে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে পরিক্ষামূলক একটি ওয়েবসাইট চালু করেন।

তিনি যা আশা করেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য তিনি পান। কোন রকম বিজ্ঞাপন ছাড়াই প্রথম ৩০ দিনে আমেরিকা সহ ৪৫ দেশে বই বিক্রি করে ফেলেন। মাত্র দুই মাসেই তার সাপ্তাহিক বিক্রির পরিমাণ ২০,০০০ ডলারে পৌঁছায়। এত কম সময়ে এতটা সাফল্য তিনি কিংবা তার টীমের কেও আশা করেননি।

১৯৯৭ সালে বেটা টেস্টিং শেষে পাকাপাকি ভাবে ব্যবসা শুরু করে দেন জেফ বেজোস। অনেকেই ভেবেছিলেন আমাজন কোনভাবেই ব্যবসা সফল হবেনা কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমান করে দিয়ে আমাজন এগিয়ে যেতে থাকে।

১৯৯৮ সালে বেজোস বই থেকে ধীরে ধীরে সিডি ও ভিডিও টেপ বিক্রয় শুরু করে দেন। বড় বড় কম্পানি আমাজনের সাথে চুক্তিতে এসে পোষাক, ইলেক্ট্রনিক পন্য সহ আরও অনেক কিছুই যুক্ত করতে থাকে।

ধীরে ধীরে আমাজন এক জায়ান্ট কম্পানিতে রুপ নিতে থাকে। যার প্রবাহ আজও চলছে।

বিখ্যাত পত্রিকার মালিকানা ক্রয়

জেফ ২০১৩ সালে বিখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট এর সমস্ত প্রকাশনা কিনে সারা দুনিয়া ব্যাপি সারা ফেলে দেয়। তিনি ২৫ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে বিখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে নেন, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ২১০০ কোটি টাকা। এতে ওয়াশিংটন পোস্টের ওপর গ্রাহাম পরিবারের চার পুরুষের মালিকানার ইতি ঘটে।

২০১৩ সালে আবার খবরের শিরোনাম বেজোস

“আমাজন প্রাইম এয়ার” প্রজেক্টের কারনে আবার শিরোনাম হন জেফ বেজোস।এই প্রকল্পের অধীনে তিনি আমাজন বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত রিমোট চালিত ড্রোন দিয়ে পন্য গ্রাহকের দরজায় পৌছে দিতে চান।

এছাড়া একই সালে তিনি ভিডিও প্রোডাকশন ব্যবসায়ও সাফল্য পেয়ে যান। ২০১৪ সালে দুইটি হিট টিভি শো নিরমান করেন TransperentMozart in the Jungle নামে। ২০১৫ সালে আমাজন প্রথম অরিজিনাল ফিচার ফিল্ম Chiraq মুক্তি দেয়। ২০১৬ সালে জেফ Star Trek Beyond সিনেমায় এলিয়েনের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন।

২০১৭ সাল প্রথমবারের মত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী

২০১৭ সালের জুলাই মাসে জেফ প্রথমবারের মত দীর্ঘ সময় এক নম্বরে থাকা বিল গেটসকে টপকিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে তার কিছু দিন পরেই আবার তিনি দুই নম্বরে চলে আসেন।

জেফ বেজোসের  অন্যান্য অর্জন

১৯৯৯ সালে জেফ বেজোস টাইম ম্যাগাজিনের পারসন অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালে জেফ বেজোস কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী পান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে।

২০০০ সালে জেফ বেজোস Blue Origin নামে একটি কম্পানি গঠন করেন যার মাধ্যমে মানুষ মহাকাশে ভ্রমন করতে পারবে। শুরুতে তিনি বিষয়টি গোপন রাখলেও ২০০৬ সালে এটি প্রকাশ পেয়ে যায়।

জেফ বেজোস এর ডিভোর্স

জেফ বেজোস ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে তার স্ত্রী ম্যাকেঞ্জির সাথে ডিভোরসের ঘোষনা দেন। ঐ সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। একই বছর ৪ এপ্রিল এজন্য তাকে ৩৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার দিতে হয় স্ত্রীকে। সম্পদ কমে হয়ে যায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার।

সময়ের সাথে জেফ বেজোসের সম্পদের পরিমান

জেফ বেজোসের সম্পদ কিভাবে সময়ের সাথে বেড়েছে খেয়াল করুন।

ক্রমিক বছর নেট সম্পদ
জুন, ১৯৯৮ ১ বিলিয়ন ডলার
জুন ১৯৯৯ ১০ বিলিয়ন ডলার
মার্চ ২০০০ ৬ বিলিয়ন ডলার
ডিসেম্বর ২০০০ ২ বিলিয়ন ডলার
সেপ্টেম্বর ২০০১ ১.৫ বিলিয়ন ডলার
সেপ্টেম্বর ২০০৩ ২.৫ বিলিয়ন ডলার
সেপ্টেম্বর ২০০৪ ৫.১ বিলিয়ন ডলার
সেপ্টেম্বর ২০০৫ ৪.১ বিলিয়ন ডলার
সেপ্টেম্বর ২০০৬ ৪.৩ বিলিয়ন ডলার
১০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ ৮.৭  বিলিয়ন ডলার
১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ৮.২  বিলিয়ন ডলার
১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ ৬.৮  বিলিয়ন ডলার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ ১২.৬  বিলিয়ন ডলার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ ১৮  বিলিয়ন ডলার
১৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ ২৯ বিলিয়ন ডলার
১৬ অক্টোবর ২০১৩ ৩০.৫ বিলিয়ন ডলার
১৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ৫০ বিলিয়ন ডলার
১৮ জুলাই ২০১৫ ৪৫ বিলিয়ন ডলার
১৯ অক্টোবর ২০১৬ ৭৩ বিলিয়ন ডলার
২০ ডিসেম্বর ২০১৭ ১৫০ বিলিয়ন ডলার
২১ জুলাই ২০১৮ ১৭০ বিলিয়ন ডলার
২২ এপ্রিল ২০১৯ ১১৪ বিলিয়ন ডলার
২৩ জুলাই ২০২০ ১৯০ বিলিয়ন ডলার

 

জেফ বেজোসের দুর্নাম

একথা সবার মুখে মুখে জেফ বেজোস দান খয়রাতে হাত খাটো। এব্যাপারে সারা আমেরিকা জুড়েই তার দুর্নাম যদিও তিনি কম বেশি চ্যারিটির সাথে যুক্ত।

জেফ বেজোসের ব্যর্থতা

জেফ বেজোসের সব প্রকল্প যে লাভের মুখ দেখছে তা কিন্তু না। ২০১৪ সালে আমাজনের মোবাইল ফোন ফায়ারফোন বাজারে আসে যা গ্রাহকদের মোটেই নজর কাড়তে পারেনি। মূলত জটিল ইউজার ইন্টারফেস্কেই এর জন্য দায়ি করা হয়। জেফ পরের বছর আর ফোনটি আর বাজারে ছাড়েন নি।

আমাজন শেয়ারের পতন ২০০১ এবং বর্তমান

আমাজন যে বছর শেয়ার বাজারে আসে সেদিন জেফের সম্পদের পরিমান একবারে বেড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। আবার অক্টোবার ২০০১ সালে আমাজনের শেয়ারের দাম কমে সর্ব নিম্ন ৫ ডলারে নেমে আসে এতে জেফের সম্পদ কমে ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

বর্তমান বাজারে আমাজনের শেয়ারের মূল্য ২০৫০ ডলারের বেশি। কোন বুদ্ধিমান লোক যদি ২০০১ সালে ১০,০০০ ডলারের আমাজনের শেয়ার কিনে রাখে তাহলে আজ সে ৪.১ মিলিয়ন ডলারের শেয়ারের মালিক বনে গেছে। ব্যাপারটি ভাবুন একবার।

শুধু তাই না একবার ভাবুন জেফ বেজোস এর স্ত্রী জেফের সম্পদের ২৫% মালিক হয়ে আজ বিশ্বের সেরা ১৫ ধনীর মধ্যে একজন এবং সে বর্তমান পৃথিবীর সর্বচ্চো ধনী মহিলা। মাথা খারাপ হবার মতই ব্যাপার।

পরিশেষে

১৯৯৪ সালে জেফ বেজোসের যে চাকুরি এবং পদমর্যাদা ছিল কোন বোকার হদ্দও সেই চাকুরি ছেড়ে দিবে না একথা লিখে দেয়া যায় কিন্তু তিনি তাই করেছিলেন। অনেকেই হয়ত তাকে বোকাদের রাজা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কি ভেবেছিলেন এই জেফ বেজোস ধীরে ধীরে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ধনীদের একজন হতে চলেছেন।

আশা করি জেফ বেজোসের জীবনের ঘটনাগুলো আপনার মনকে সামান্য হলেও দোলা দিতে সক্ষম হবে। আপনিও লেগে থাকুন, কে জানে আপনি হয়ে উঠবেন বাংলার জেফ বেজোস। ধন্যবাদ সবাইকে।